
নতুন বার্তা ডেস্ক
নয়া দিল্লি: আর কোনো রাখঢাক নেই। দাদরির ঘটনাকে শুধু সরাসরি সমর্থনই নয়,
গরুর মাংস ‘বিতর্কে’ একেবারে খুনেরই হুমকি দিল ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন
বিজেপি-র চালিকা শক্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)।রোববার তাদের হিন্দি মুখপত্র ‘পাঞ্চজন্য’-এর এক নিবন্ধে বেদের দোহাই দিয়ে দাদরির খুনের সমর্থনে আরএসএস-এর দাবি, গোহত্যাকারীদের মেরে ফেলারই নির্দেশ রয়েছে বেদে। তাই বাড়িতে গরুর মাংস খেয়েছিলেন যে মুহম্মদ আখলাক তাকে মেরে ফেলে সঠিক কাজই করা হয়েছে।
রোববার আরএসএস-এর মুখপত্রে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে গোহত্যাকারীদের ‘পাপী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়েছে, ‘‘বেদ কা আদেশ হ্যায় কি গাও হত্যা করনে ওয়ালে পাতকী কে প্রাণ লে লো।’’- ‘বেদের আদেশ, যারা গোহত্যা করবে, সেই পাপীর প্রাণ নিয়ে নাও।’’ প্রতিবেদক বিনয়কৃষ্ণ চতুর্বেদী ‘তুফাইল’ ছদ্মনামে প্রতিবেদনটি লিখেছেন।
দাদরিকাণ্ডসহ দেশে সাম্প্রদায়িকতার অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদ জানাতে যে সমস্ত লেখক-সাহিত্যিক নিজেদের পুরস্কার-পদক ফিরিয়ে দিয়েছেন তাদেরও আক্রমণ করা হয়েছে আরএসএস মুখপত্রে। সেখানের কভার স্টোরির ওই নিবন্ধে বিনয়কৃষ্ণ চতুর্বেদী কটাক্ষ করে লিখেছেন, ‘‘আপনারা তো আখলাকের গোহত্যাটাকে নজরই করছেন না। আপনার আখলাকের মৃত্যুর গোটা ঘটনাটাই খেয়াল করছেন না, কোথাও কখনও লেখা হয়নি ওই গ্রামের কারো সঙ্গে আখলাকের শত্রুতা ছিল।’’
শুধু বেদ নয়, নিবন্ধে আইজাক নিউটনকেও টেনে এনেছে আরএসএস। গুজরাট গণহত্যার দায় লঘু করতে বিজেপি নেতারা নিউটনের তৃতীয় সূত্রের উল্লেখ করেছিলেন। আর এবার দাদারির ঘটনা যে এক ‘স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া’ তা প্রমাণ করতে আরএসএস মুখপত্র আশ্রয় নিয়েছে সেই ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া’-র তত্ত্ব। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘গোহত্যা হিন্দুদের সম্মানে আঘাত দেয়। এটা আমাদের কাছে জীবন-মৃত্যুর বিষয়।’ প্রতিবেদকের প্রশ্ন, আপনারা তো এটা দেখছেন না, গোরু নিয়ে এমন চিন্তাধারার একটা সমাজে থেকে আখলাক কী করে গোরু হত্যার মতো কাজ করতে পারলেন। তাই দাদরিকাণ্ড যে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এটা জাহির করে আরএসএস বলেছে, ‘‘আপনি যদি ৮০শতাংশ সংখ্যাগুরুর ভাবাবেগকে সম্মান দিতে না পারেন, তাহলে কী করে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া ঠেকানো যাবে।’’
শুধু তাই নয়, দাদরির খুনিদের বাহবা দিতে ওই নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ‘‘তোষণের সুযোগ নিয়ে গোহত্যা করে যারা পাপ করছে সমাজ তাদের মনে রাখবে না। সমাজে তাদেরই মহান বলে চিহ্নিত করবে যাঁরা তা ঠেকাতে গিয়ে শহীদ হবেন।’’ আরও লেখা হয়েছে যে, মাদ্রাসাগুলি এবং মুসলিম ধর্মীয় নেতারা ভারতীয় মুসলমিদের শেখায় ভারতীয় পরম্পরাকে ঘৃণা করতে। সেই শিক্ষার কুপ্রভাবেই সম্ভবত আখলাক গোহত্যা করেন, মন্তব্য প্রতিবেদকের।
ফ্রিজে গোমাংস রাখার গুজব তুলে গত ২৮ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের দাদরিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক গ্রামবাসীকে পিটিয়ে মারার অভিযোগ ওঠে। একই কায়দায় বজরঙ দলের লোকজন হিমাচল প্রদেশে এক যুবককে খুন করেছে। একইভাবে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল মধ্য প্রদেশের সিহোরা শহরে। গোহত্যার অভিযোগে সেখানে বিক্ষোভ দেখায় উত্তেজিত জনতা। যদিও পুলিশ এবং স্থানীয়দের মতে, গোহত্যার মতো ঘটনা ঘটেনি। গোমাংস খাওয়ার গুজবের জেরে নিগ্রহের শিকার হয়েছেন জম্মু-কাশ্মীর বিধায়ক শেখ আব্দুল রশিদ।
দাদরি হত্যা এবং গোমাংস নিয়ে একের পর এক হিংসার ঘটনায় সরব বিরোধীরা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিজেপি নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য। শনিবারই গোহত্যায় মৃত্যুদণ্ডের আইন চেয়ে বসেছেন বিজেপি-র বিতর্কিত সাংসদ সাক্ষী মহারাজ। গোহত্যার শাস্তি হিসাবে প্রাণদণ্ডই দেওয়া উচিত মতপ্রকাশ করেছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, গোমাংস খাওয়ার গুজবে জম্মু-কাশ্মীর বিধায়ক শেখ আব্দুল রশিদকে নিগ্রহকেও সঠিক বলে মন্তব্য করেন তিনি। শ্রীনগরে রশিদের সেই পার্টি আসলে “বিফ-পার্টি” ছিল বলে অভিযোগ। বিধানসভায় সম্প্রতি ওই বিধায়ককে নিগ্রহ করা হয়। উত্তর প্রদেশের উন্নাওয়ের সাংসদ সাক্ষী মহারাজ বলেন, “নেতাদের উচিত, নিজেদের মতাদর্শ বদলানো। না হলে জনতাই সর্বসমক্ষে নেতাদের পিটিয়ে মারবে।”
সাক্ষী মহারাজের এই মন্তব্য নিয়েও ফের বিতর্ক দানা বেধেছে। সূত্রের খবর, এ ধরনের মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে বলে রবিবার দলীয় নেতাদের নাকি সতর্ক করেছেন অমিত শাহ। ডাকা হয়েছে, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টরসহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মহেশ শর্মা, দলীয় নেতা সংগীত সোম এবং সাংসদ সাক্ষী মহারাজ।
দাদরিকাণ্ডের জেরে একেই অস্বস্তিতে মোদি সরকার। এ বার কেন্দ্রীয় সরকারকে আরও অস্বস্তিতে ফেললো আরএসএস-র মুখপত্র। এরই সঙ্গে এদিন বিজেপি-র সবচেয়ে পুরানো শরিক আকালি দলের তরফে দাদরির ঘটনা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছে। শরিক দলের সাংসদ নরেশ গুজরাল, দাদরিতে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য ঘুরিয়ে প্রধানমন্ত্রীকেই মৃদু আক্রমণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাংসদ। যা আরও অস্বস্তি বাড়িয়েছে সরকারের। বিতর্কিত মন্তব্যে পটু নেতাদের ডেকে তাই হয়তো খানিকটা মুখরক্ষা করতে তৎপর হয়েছে বিজেপি-র শীর্ষ মহল। রবিবার দলীয় হেড কোয়ার্টারে হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খাট্টার, কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী মহেশ শর্মা, বিধায়ক সংগীত সোম এবং বিজেপি সাংসদ সাক্ষী মহারাজকে ডেকে পাঠান বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ।
কোনোরকম বিতর্কিত মন্তব্য না করতে সেই নেতা-মন্ত্রীদের নাকি সতর্ক করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাকি খুবই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে দাবি। তিনিই অমিত শাহকে ডেকে এই নেতাদের সতর্ক করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। বৈঠক শেষে বিধায়ক সংগীত সোম সাংবাদিকদের অবশ্য জানান যে দলীয় বিষয়ে আলোচনা করতেই তাদের ডেকে পাঠানো হয়।- ওয়েবসাইট
নতুন বার্তা/এসএ

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন