রবীন্দ্রসাহিত্যের বিষক্রিয়া ও বাঙালী মুসলিমের আত্মপচন ফিরোজ মাহবুব কামাল - rangpur news

Breaking

Breaking News

rangpur news

This is news blog site.Here have important online newspaper.if you Concert:MD.Gulam azam sarkar. E-mail:gulamazam@gmail.com Mobil:01735632338

Windows

test banner

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

সোমবার, ১ জুন, ২০১৫

রবীন্দ্রসাহিত্যের বিষক্রিয়া ও বাঙালী মুসলিমের আত্মপচন ফিরোজ মাহবুব কামাল

রবীন্দ্রসাহিত্যের বিষক্রিয়া ও বাঙালী মুসলিমের আত্মপচন

 

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

বাঙালীর রবীন্দ্রাসক্তি ও আত্মপচন

দৈহিক পচনের ন্যায় আত্মপচনের আলামতগুলিও গোপন থাকে না। আত্মপচনে মৃত্যু ঘটে বিবেকের; তাতে বিলুপ্ত হয় নীতি ও নৈতিকতা। চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, সন্ত্রাস, গুম, হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্ষণে উৎসব,লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে হত্যা, পুলিশী রিম্যান্ডে হত্যা, ক্রসফায়ারে হত্যাএ রূপ নানা নিষ্ঠুরতা তখন নিত্তনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অতি নির্মম ও নিষ্ঠুর কাজেও তখন বিবেকের পক্ষ থেকে বাঁধা থাকে না। এর ফলে রাস্তাঘাটে শুধু অর্থকড়ি,গহনা ও গাড়ি ছিনতাই হয় না, নারী ছিনতাইও শুরু হয়। পত্রিকায় প্রকাশ, মাত্র গত তিন মাসে দেশে ১২৩ জন মহিলা ছিনতাই ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। (দৈনিক আমার দেশ, ২৬/০৫/১৫)।
তবে সব ধর্ষিতাই যে থানায় এসে নিজের ধর্ষিতা হওয়ার খবরটি জানায় -তা নয়। কারণ তাতে অপরাধীর শাস্তি মেলে না বরং সমাজে ধর্ষিতা রূপে প্রচার পাওয়ায় অপমান বাড়ে। অধীকাংশ ধর্ষণের ঘটনা তাই গোপনই থেকে যায়।ফলে ধর্ষিতা নারীদের আসল সংখ্যা যে বহুগুণ বেশী তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়।জাহিলিয়াত যুগের আরবগণ এরূপ আত্মপচনের ফলে নানারূপ নিষ্ঠুরতায় ডুবেছিল। কন্যাদের তারা জীবন্ত দাফন দিত। সন্ত্রাস, রাহাজানি, ব্যাভিচারি, কলহ-বিবাদ ও গোত্রীয় যুদ্ধে ডুবে থাকাই ছিল তাদের সংস্কৃতি।


তবে জাহেলিয়াত যুগের আরবগণ আত্মপচন থেকে শুধু যে রক্ষা পেয়েছিল তা নয়,সমগ্র মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতারও জন্ম দিয়েছিল। তারা যে দ্রুত বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল সেটিই মূল নয়,নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রেও যে উচ্চতায় তারা পৌঁছেছিল -অন্য কোন জাতি সে স্তরে কোন কালেই পৌঁছতে পারিনি। কীরূপে তারা সে পচন থেকে রক্ষা পেল,কীভাবে তারা এত উপরে উঠলো এবং বাঙালী মুসলিমেরাই বা কেন এত দ্রুত নীচে নামছে -সেটিই আজ সমাজ বিজ্ঞানের অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।পতিত আরবদের এত দ্রুত উপরে উঠার মাঝেই নিহীত রয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ শয্যাশায়ী কান্সারের রোগীও যে ঔষধে সুস্থ্য হয়ে উঠে সে ঔষধ থেকে মানব জাতি দৃষ্টি ফেরায় কি করে? আরবগণ  জেগে উঠে প্রমাণ করে গেছে আত্মপচনেরও মোক্ষম চিকিৎসা আছে। মানবজাতির জন্য তাদের সে শিক্ষাটিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা। আকাশে উড়া,চাঁদে নামা ও আনবিক বোমার তৈরীর বিদ্যা না শিখিয়ে তারা শিখিয়ে গেছে আত্মপচনের পর্যায় থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক রূপে বেড়ে উঠার বিদ্যা। এর চেয়ে উপকারি বিদ্যা আর কি হতে পারে? দেহে যে রোগ আছে শুধু এটুকু জেনে লাভ কী? লাভ তো রোগের সুচিকিৎসাটি জানায়। বাঙালী মুসলিমের এখানেই ব্যর্থতা। গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশে বিশ্বে দ্বিতীয়, মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ। পাঠ উৎপাদনে শীর্ষে। কিন্তু দুর্বৃত্ত উৎপাদন বিপুল সংখ্যায় হওয়ায় অন্যসব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দুর্বৃত্তদের কারণে বাংলাদেশ দ্রুত বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার বাঙালী মুসলমান দেশ ছাড়ছে রহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে।নিজ দেশ ছেড়ে তারা গভীর সমুদ্রে গিয়ে ভাসছে, অন্য দেশে আশ্রয় না পেয়ে প্রাণ বাঁচাতে মূত্রপান করছে।আরবদের পচনটি কোন কালেই কি এ পর্যায়ে পৌছেছে? নিজ দেশ ছেড়ে তারা কি কখনো সাগরে গিয়ে ভেসেছে? গভীর সংকটের আরো  কারণ,এরূপ ভয়ানক বিপর্যের মাঝে পড়েও বাঙালী মুসলিমের আগ্রহ নেই রোগের কারণ ও তার চিকিৎসা নিয়ে। দেশে কৃষিপণ্য,শিল্পপণ্য,মৎস্য চাষ, গরুমহিষের আবাদ বা মনুষ্যজীবের রপ্তানি বেড়েছে। কিন্তু তা দিয়ে কি আত্মপচন থেকে বাঁচা যায়? আত্মপচনের কারণটি অর্থাভাব, খাদ্যাভাব, দেহের অপুষ্টি বা রোগব্যাধী নয়। বরং সেটি মনের প্রচন্ড অপুষ্টি ও অসুস্থ্যতা। মনের সে অপুষ্টি ও অসুস্থ্যতার কারণ,জ্ঞানশূণ্যতা। এবং সে জ্ঞানশূণ্যতাটি পবিত্র ওহীর জ্ঞানের। দেহ বল পায় পুষ্টিকর খাদ্য থেকে; এবং বিবেক পুষ্টি পায় সত্যজ্ঞান ও সঠিক দর্শন থেকে। নিরেট সত্য ও সঠিক দর্শনের উৎস্য তো মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত গ্রন্থ। চেতনার রোগ সারাতে ও বিবেককে সবল করতে সে নাযিলকৃত সত্যের সামর্থটি বিশাল। সেটি প্রমাণিত হয়েছে আজ থেকে সাড়ে ১৪ শত বছর আগে। মুসলিম মন তখন প্রবল পুষ্টি পেয়েছিল পবিত্র কোরআন থেকে। তাতে দূর হয়েছিল আরব মনের অসুস্থ্যতা। ফলে এককালের অসভ্য আরবগণ অতিদ্রুত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত হতে পেরেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাঙালী মনের সে অসুস্থ্যতা সারাতে বাংলাদেশে সত্যজ্ঞান ও দর্শনের উৎস্যটি কি? সেটি কি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান? সেটি কি সেক্যুলার বাঙালী সাহিত্যিকদের লেখা প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস? সেটি কি মুক্তমনা নাস্তিকদের দর্শন? সেক্যুলার বাঙালীরা তো ভেবেছে এগুলিই তাদের শান্তি ও প্রগতির পথ দেখাবে। কিন্তু সেটি যে মিথ্যা সেটি প্রমাণ করতে কি আরো নীচে নামতে হবে? আরো কত হাজার বাঙালীকে সমুদ্রে ভেসে মূত্রপান করতে হবে? আরো কত হাজার নারীকে ধর্ষণ ও সে ধর্ষণের ইতর উৎসব দেখতে হবে? শাপলা চত্বরের গণহত্যাই আর কত বার সহ্য করবে? কতবার দেখবে ভোট-ডাকাতির নির্বাচন?



সেক্যুলার রাজনীতির নাশকতা

বাংলাদেশে আজ যে ভয়ানক আত্মপচন তার মূল কারণঃ চেতনায় ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ভয়ানক বিষক্রিয়া। আর সেটি সেক্যুলার রাজনীতি ও কুসাহিত্যের কারণে। পানির পাইপ যেমন গৃহে গৃহে দূষিত পানির সরবরাহ বাড়ায়, তেমনি কুসাহিত্যের মাধ্যমে নরনারীর চেতনাতেও লাগাতর বিষপান ঘটে। বাংলাদেশে সে কাজটি প্রচন্ড ভাবে হয়েছে। বিগত শত বছরে বাঙালীর ভাত-মাছ-ডাল-শাক-সবজি তথা খাদ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। বাংলার গাছপালা,আলোবাতাস বা জলবায়ুতেও তেমন পরিবর্তন আসেনি।কলেরা-টাইফয়েড-ম্যালেরিয়ার স্থলে কোন নতুন রোগেরও আবির্ভাব হয়নি। ফলে বর্তমান বিপর্যয়ের জন্য এর কোনটিকেও দোষ দেয়া যায় না।  বিগত শত বছরে বাংলার বুকে বিশাল পরিবর্তন এসেছে মূলতঃ দুটি ক্ষেত্রে। এক). বাংলার মুসলিম গৃহে শত বছর আগে রবীন্দ্র সাহিত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গিতের চর্চা ছিল না। নাচগানও ছিল না। নাচগান সীমিত ছিল হিন্দু ও পতিতাপল্লির বাইজীদের গৃহে। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গিত ও নাচগান এখন নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের গৃহে। সমগ্র দেশজুড়ে হাজার হাজার এনজিও গড়ে উঠেছে যাদের কাজ হয়েছে সেগুলি শেখানো।দুই). শত বছর আগে বাংলার রাজনীতিতে সেক্যুলারিস্টদের স্থান ছিল না। রাজনীতিতে তখন ইসলামের প্রতি প্রবল অঙ্গিকার ছিল। ফলে বাংলার মাটিতে সেদিন গড়ে উঠেছিল খেলাফত আন্দোলন ও  পাকিস্তান আন্দোলনের ন্যায় দুটি বিশাল গণআন্দোলন। অথচ আজ  দেশ অধিকৃত হয়ে আছে ধর্মচ্যুৎ ও ইসলামচ্যুৎ উগ্র সেক্যুলারিস্টদের হাতে। তাদের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে। কোরআনে তাফসির বন্ধ করা, জিহাদবিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা, ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে ঝুলানো,মুসল্লিদের হত্যাকরা এবং তাদের লাশকে ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করাই তাদের সংস্কৃতি। তাদের নেতৃত্বে দেশে যা শুরু হয়েছে তা মূলত পৌত্তলিক সাহিত্য ও সেক্যুলার রাজনীতিরই ভয়ানক বিষক্রিয়া। বাঙালী মুসলমানের আজকের আত্মপচনের মূল কারণ হলো এটি।


দেশে আজ স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্র-পত্রিকার সংখ্যা বিপুল। কিন্তু তাতে সত্যজ্ঞান ও সত্য-দর্শনের আবাদ বাড়েনি; বরং বেড়েছে ঈমানবিনাশী বিষপানের মহা আয়োজন। জনগণের জীবনে এখন শুরু হয়েছে তারই বিষক্রিয়া। ইসলামের পূর্বে আরবী সাহিত্যে বিষপানের যে আয়োজনটি ছিল, সে তুলনায় বাংলাভাষার ভাণ্ডারটি বিশাল। পৌত্তলিকদের এতবড় সাহিত্যভাণ্ডার বিশ্বের আর কোন ভাষায় নেই। এ কাজে রবীন্দ্রনাথের তো নবেল প্রাইজও মিলেছে। তবে এ ভাণ্ডার শুধু রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট নয়,বরং গড়ে উঠেছে শত শত বাঙালী পৌত্তলিক সাহিত্যিকের সম্মিলিত চেষ্টায়।আধুনিক বাংলা গড়ে উঠেছে মূলত হিন্দুদের দ্বারা। এবং সেটি হিন্দুদের গোড়া হিন্দু রূপে গড়ে তোলার প্রয়োজনে। বাংলা ভাষার শতকরা ৯০ ভাগের বেশী বইয়ের লেখক তারাই। ফলে বেদ, পুরান, গীতা,উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারতের চরিত্রগুলি তাই বাংলা সাহিত্যে অতি সরব ও সোচ্চার। শুধু বঙ্কিম সাহিত্যে নয়, রবীন্দ্র সাহিত্যেও হিন্দু ধর্ম, হিন্দু একতা ও হিন্দুরাজের চেতনাটি যে কতটা প্রকট সেটিও এ প্রবন্ধে নীচে তুলে ধরা হয়েছে।


ঈমান,আমল ও সৎ চরিত্র নিয়ে বাঁচতে হলে চেতনার সুস্বাস্থটি জরুরী। চেতনার মানচিত্রে লাগাতর বিষ ঢুকলে সেটি  সম্ভব নয়, অথচ পৌত্তলিক সাহিত্য পাঠে তো সেটিই ঘটে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ অতীতে এ বিষের ভাণ্ডারকে তাই সতর্কতার সাথে পরিহার করেছে। তারা বরং চেতনায় পুষ্টি জুগিয়েছে উর্দু ও ফার্সী ভাষা থেকে। কিন্তু ১৯৭১য়ের ডিসেম্বরে যুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিকৃতি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর সংযোগ গড়া হয় হিন্দুদের গড়া পৌত্তলিক বিষ ভান্ডারের সাথে। জ্ঞানচর্চার অঙ্গণে সংযোগ ছিন্ন করা হয় পবিত্র কোরআনের সাথেও। বাঙালী মুসলিমের চেতনায় তখন বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় ঢুকানো হয় পৌত্তলিক সাহিত্য, সিনেমা ও গান। পৌত্তলিক চেতনায় সমৃদ্ধ বরীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলা গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়া হয়।অথচ সে লক্ষে এ গানটি লেখা হয়নি।


বিবেকে বিষক্রিয়া

শিক্ষা ও সাহিত্যের নামে লাগাতর বিষপান হলে বিবেকে বিষক্রিয়া দেখা দিবে সেটিই তো স্বাভাবিক। তখন সৃষ্টি হয় চরম নৈতিক বিপর্যয়। মুসলিম শিশুদের মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি বিশাল। একাজ শুধু পিতামাতা ও মসজিদ-মাদ্রাসার দ্বারা হওয়ার নয়। বরং সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টিভি,পত্রপত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থার। ছাত্রদের শুধু বিষপান থেকে বাঁচালে চলে না, তাদের চেতনায় কোরআনী জ্ঞানের পুষ্টিও জোগাতে হয়।রাষ্ট্রের ঘাড়ে এটিই সবচেয়ে বড় দায়ভার। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে সরকারের পক্ষ থেকে সে দায়িত্ব পালিত হয়নি। মুসলিম শিশুকে মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি সরকারি মহলে সাম্প্রদায়িকতা গণ্য হয়।অথচ স্কুল-কলেজে পৌত্তলিক সাহিত্য পড়ানোর কাজটি সরকার নিজ কাঁধে নিয়েছে। অতি পরিকল্পিত ভাবেই ছাত্র-ছাত্রীদের কোরআন বুঝার সামর্থ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হয়নি।অথচ সে সামর্থ অর্জনটি প্রতিটি মুসলমান নরনারীর উপর ফরজ। সরকারের এরূপ ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতির কারণে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ, আইনবিদ,হিসাববিদ ও অন্যান্য পেশাধারি তৈরী হলেও সত্যিকার মুসলিম তৈরী হচ্ছে খুব কমই। যারা হচ্ছে তারা নিজ উদ্যোগে।কোরআনী জ্ঞানের জ্ঞানশূণ্যতায় কি ঈমান বাঁচে? বাঁচে কি চরিত্র? ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ঈমাননাশ ও চরিত্রনাশের মহামারি ছেয়ে গেছে সমগ্র দেশ জুড়ে। ফলে জাহেলী যুগের আরবদের চেয়েও ভয়াবহ দুর্বৃত্তি নেমে এসেছে বাংলাদেশের উপর।লাগাতর বিষপানের পরিণতিতে এ ভয়ানক বিষক্রিয়া। ইসলামপূর্ব যুগে আরবের জাহেলগণ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে শিরোপা পেয়েছে -সে প্রমাণ ইতিহাসে নেই। লুন্ঠনে লুন্ঠনে দেশের বুকে তারা দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছে বা মহিলাদের মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য করেছে -সে প্রমাণও নেই। বরং জাহিলিয়াতের যুগেও মেহমানদারিতে তাদের সুনাম ছিল, হাতেম তায়ীর মত ব্যক্তিও তাদের মাঝে জন্ম নিয়েছে। বিদেশীদের ঘরে তারা কখনোই নিজেদের কন্যা, বোন বা স্ত্রীদেরও রপ্তানি করেনি। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশী জাহেলদের নীচে নামার অর্জনটি তো বিশাল। দুর্বৃত্তিতে তারা বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছে; কাপড়ের অভাবে মহিলারা বাধ্য হয়েছে মাছধরা জাল পড়তে। এবং নারী রপ্তানি পরিণত হয়েছে দেশের অর্থনীতিতে।


হাসিনা বর্বরতার আরেক ইতিহাস গড়েছে অন্য ভাবে। সেটি প্রাণ বাঁচাতে আসা ও সমুদ্রে ভাসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বঙ্গীয় উপকূলে উঠতে না দিয়ে। সে বর্বরতাটিও বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। এমন কি জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল মিষ্টার বান কি মুনও তাকে এরূপ নিষ্ঠুর আচরন পরিহারে আহবান জানিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের প্রতি সদয় হতে বলেছিলেন। কিন্তু বিবেকহীন নিষ্ঠুরতাই যার রাজনীতির মূলমন্ত্র, তার কাছে কি মানবতা বা কারো সুপরামর্শ গুরুত্ব পায়? এখন রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে খোদ বাংলাদেশীরা কদর্য ইতিহাস গড়ছে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও নানা দেশে চাকুরির সন্ধানে নেমে। মালয়েশিয়ার সরকারের দাবী,সমূদ্রে ভাসা উদ্বাস্তুদের শতকরা ৭০ ভাই বাংলাদেশী।(এ প্রবন্ধের লেখক নিজে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় এমন বাংলাদেশীদের দেখেছেন যারা নিজেরাই লেখককে বলেছে,রোহিঙ্গা পরিচয় দিয়ে তারা তুরস্কের সরকার থেকে নিয়মিত ভাতা নিচ্ছে এবং সে সাথে কারখানায় কাজও করছে।) অপর দিকে বিহারীদের সাথে কৃত নিষ্ঠুরতা কি কম? স্রেফ অবাঙালী হওয়ার কারণে প্রায় ৪ লক্ষ বিহারীকে তাদের ঘরবাড়ী ও দোকান-পাট থেকে নামিয়ে সেগুলির দখল করে নিয়েছে বাঙালীরা। অথচ ১৯৭১য়ের পর সে পাকিস্তানে অবাঙালীদের মাঝে গিয়ে উঠেছে ১০ লাখের বেশী বাঙালী।


কোন দেশই দুয়েকজন নাগরিকের আত্মপচন, চুরিডাকাতি ও খুনখারাবীর কারণে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে না। সেরূপ রেকর্ড গড়তে আত্মপচনটি মহামারি রূপে দেখা দেয়া জরুরী। তেমনি এক আত্মপচনের মহামারি ছেয়ে গেছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। ফলে দেশজুড়ে ভোট ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ার মার্কেট লুট বা শাপলা চত্বরের ন্যায় নৃশংস গণহত্যাও তখন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।বিবেকের এ মহামারিতে চিকিৎসাতেও কোন আগ্রহ থাকে না।চোর-ডাকাতদের পাড়ায় চুরি-ডাকাতি,খুন-ধর্ষণ ও সন্ত্রাস নিয়ে তাই কখনো বিচার বসে না। তা নিয়ে কারো লজ্জাবোধও হয় না।বরং সে মহল্লায় পাপকর্মে যার অধীক সামর্থ তাকে নিয়ে গর্ব হয়;এবং উৎসবেরও আয়োজন হয়।জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসব এবং এবারের বাংলা নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে মহিলাদের কাপড় খুলে শ্লীলতাহানির উৎসবের পিছনে তো তেমনি এক অসুস্থ্য চেতনা কাজ করেছে। ধর্ষকদের কাছে প্রতিটি সফল ধর্ষণ এবং ডাকাতদের কাছে প্রতিটি সফল ডাকাতিতেই তো উৎসব। তাই যে দুর্বৃত্তপাড়ায় ধর্ষণ হয় বা ডাকাতি হয় সেখানে প্রচণ্ড উৎসবও হয়। ডাকাতিতে সফল নেতৃত্বের জন্য সর্দার বা সর্দারনীকে বিপুল সংবর্ধনাও দেয়া হয়।তাই প্রতিদিন উৎসব লেগে আছে বাংলাদেশের মন্ত্রীপাড়ায়, সরকারি দলের অফিসে, দলীয়কর্মীদের ঘরে ঘরে এবং সরকারি প্রশাসনে।এমন উৎসবমুখর মহলে ভোটডাকাতি,ব্যাংকডাকাতি, দুর্বৃত্তি,সন্ত্রাস,মানবপাচার,নারীপাচার,গভীর সমূদ্রে ভাসমান হাজার হাজার বাংলাদেশী ও জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গাদের প্রস্রাবপান নিয়ে তাদের মাঝে দুশ্চিন্তা থাকার কথা নয়।লজ্জা-শরম থাকারও কথা নয়। বরং যা হবার তাই হচ্ছে। সেটি ভোট-ডাকাতিতে সফল নেতৃত্ব দেয়ায় ও দলীয় নেতাকর্মীদের চুরিডাকাতির সুযোগ করে দেয়ায় হাসিনার বিপুল সংবর্ধনার। আত্মপচনের এর চেয়ে বড় আলামত আর কি হতে পারে?



রবীন্দ্র সাহিত্যে বিষভান্ডার

রবীন্দ্রসাহিত্যে হিন্দুদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রচুর উপকরণ থাকলেও বাঙালী মুসলিমদের জন্য তা ছিল এক বিশাল বিষভান্ডার। রবীন্দ্রনাথ যে কতটা মুসলিম বিরোধী ছিলেন সেটি কোন গোপন বিষয় নয়, নানা ভাবে তার প্রকাশ ঘটেছে। সে চেতনাটির প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৯০৫ সালে। বিহার,বাংলা এবং আসাম নিয়ে তখন বৃহত্তর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রদেশ ছিল। ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে বিশাল এ প্রদেশের উপর প্রশাসনিক নজরদারী রাখা তখন কঠিন পড়ে। তাই নিজেদের প্রশাসনিক স্বার্থে তারা প্রদেশটিকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে গঠন করে একটি নতুন প্রদেশ। এ নতুন প্রদেশের রাজধানি হয় ঢাকা।এ সিদ্ধান্তের পিছনে ব্রিটিশদের মনে কোনরূপ মুসলিমপ্রীতি কাজ করেনি, বরং কাজ করেছে সাম্রাজ্যবাদি স্বার্থ। কিন্তু হিন্দুরা বিষয়টিকে হিন্দু স্বার্থের বিরুদ্ধে  ক্ষতিকর রূপে গণ্য করে। পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল দরিদ্র মুসলিম। পূর্ব বাংলার সম্পদে পশ্চিম বাংলার মানুষের উন্নতি ঘটলেও পূর্ব বাংলার মানুষের তাতে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। পূর্ববাংলা ছিল কলকাতা কেন্দ্রীক কলকারখানার কাঁচা মালের প্রধানতম উৎস,কিন্তু তাদের উন্নয়নে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ১৯০৫ সালে নতুন প্রদেশ সৃষ্ট হওয়াতে পূর্ব বাংলার মুসলিমগণ শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে কিছুটা উন্নয়নের মুখ দেখেছিল। কিন্তু সেটি গণ্য হয় বহু যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত বর্ণহিন্দুদের কায়েমি স্বার্থের উপর প্রচন্ড আঘাত রূপে। তখন বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের অজুহাত খাঁড়া করে বর্ণ হিন্দুরা নতুন এ প্রদেশকে বাতিল কররা দাবীতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে আন্দোলনে সকল হিন্দু জমিদার, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক,সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা এক হয়ে যান। সেই সময় ভারতীয় কংগ্রেস শুরু করে স্বদেশী আন্দোলন। সে আন্দোলনে প্রয়োজন ছিল একজন জাতীয় হিন্দু নেতার মডেল। সে প্রয়োজন তারা ইতিহাস থেকে তুলে আনেন শিবাজীর ন্যায় ভারতের মুসলিম শাসনের কট্টোর বিরোধী ও সন্ত্রাসী শিবাজীকে। কংগ্রেসি নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দু-জাতীয়তাবাদের জনক রূপে খাড়া করেন। তখন থেকেই রাজনীতির ময়দানে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গোড়াপত্তন। শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দুদের জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে চালু করা হয় শিবাজী উৎসব। এর আগে ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় গো-রক্ষিণী সভা। এ সব আয়োজনের মাধ্যমে হিন্দু মুসলিমের মধ্যে তৈরি হয় সাম্প্রদায়িক হানাহানির পরিবেশ। ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৭ সালে এর জন্য তিলককে গ্রেফতার করে। রবীন্দ্রনাথের সাম্প্রদায়িক চেতনা তখন আর গোপন থাকেনি।  ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জনক তিলককে মুক্ত করতে তিনি তখন রাস্তায় নেমে পড়েন। তাকে মুক্ত করার জন্য অর্থ সংগ্রহে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতেও তিনি  দ্বিধা করেননি। শুধু অর্থ ভিক্ষা নয়,তিলকের আবিষ্কৃত শিবাজীর পথকেই ভারতীয় হিন্দুদের মুক্তির পথ রূপে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি নিজে মেতে উঠেছিলেন শিবাজী বন্দনায়।


রবীন্দনাথের নিজের একটি রাজনৈতিক দর্শন ছিল, ভারতীয় রাজনীতিতে সে দর্শন নিয়ে একটি প্রবল পক্ষ ছিল এবং সে পক্ষের সাথে রবীন্দ্রনাথের গভীর একাত্মতাও ছিল।  সে রাজনৈতিক দর্শনের প্রবল প্রকাশ ঘটেছে তার লেখা কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও গানে। শিবাজি উৎসব কবিতাটি হলো রবীন্দ্রনাথের তেমনি এক রাজনৈতিক দর্শনের কবিতা। সে দর্শনটি ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদের। এ কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে তার রাজনৈতিক ভাবনার সাথে তার পূজনীয় বীরের ছবি। বাঙালী হলেও রবীন্দ্রনাথ ভাবনাটি বাংলার আলো-বাতাস ও ভূগোল দিয়ে সীমিত ছিল না। তিনি ভাবতেন অখন্ড ভারত নিয়ে। অখন্ড ভারতের সে মানচিত্রে মুসলমানদের জন্য কোন স্থান ছিল না। রবীন্দ্রনাথের পিতা ও পিতামহ ব্রাহ্মধর্মের অনুসারি হলেও রবীন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখতেন একজন গোঁড়া হিন্দু রূপে। তার স্বপ্নটি ছিল সমগ্র ভারতজুড়ে হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার। সে হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে যিনি বীর রূপে যিনি গণ্য হয়েছেন তিনিও বাঙালী নন, বরং সূদুর মহারাষ্ট্রের অবাঙালী শিবাজী। শিবাজি-উৎসব কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে শিবাজির সে রাজনৈতিক মিশনের সাথে রবীন্দ্রনাথের একাত্মতা। শিবাজিকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন,

মারাঠার কোন শৈলে অরণ্যের অন্ধকারে বসে,
হে রাজা শিবাজি,
তব ভাল উদ্ভাসিয়া এ ভাবনা তড়িৎপ্রভাবৎ
এসেছিল নামি-
এক ধর্মরাজ্য পাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত
বেধে দিব আমি।

খণ্ড চ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারতকে আবার এক অখণ্ড হিন্দু ধর্মরাজ্য রূপে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন শিবাজি দেখেছিল সেটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের নিজের স্বপ্ন। সে অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আর শিবাজির চেতনা একাকার হয়ে গেছে।এখানেই রবীন্দ্রনাথ দাড়িয়েছেন শিবাজির ন্যায় ইসলাম ও মুসলমানের প্রতিপক্ষ রূপে। ভারত জুড়ে তখন মোগলদের শাসন। হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিবাজী বেছে নেয় মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসের পথ। শিবাজির  মুসলিম শাসনবিরোধী সে বিদ্রোহ ও সন্ত্রাস শতাধিক বছর পূর্বে হলেও রবীন্দ্রনাথের মনে তা নিয়ে উৎসব মুখর হয়ে উঠে। শিবাজি-উৎসব কবিতায় তো সেটিরই প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্র সাহিত্যে এভাবেই মুসলিম বিরোধী নাশকতার শুরু। রবীন্দ্রনাথের মাঝে এ নিয়ে প্রচন্ড দুঃখবোধ ছিল যে,বাঙালীগণ সে সময় শিবাজিকে চিনতে পারিনি এবং তার স্বপ্ন ও সন্ত্রাসের সাথে একাত্ম হতে পারিনি।রবীন্দ্রনাথ তার কবিতাটিতে বাঙালী বলতে যাদের বুঝিয়েছেন সেখান বাংলাভাষী মুসলমানদের কোন স্থান ছিল না । বাঙালী বলতে তিনি একমাত্র হিন্দুদেরই বুঝিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র তার লেখায় আমাদের পাড়ায় বাঙালী ও মুসলমানদের খেলা যে বাঙালীদের বুঝিয়েছিলেন সে বাঙালীদের মাঝেও বাঙালী মুসলমানদের জন্য কোন স্থান ছিল না।


বাঙালী মুসলিমের বিষপান

রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন।অখণ্ড ভারত জুড়ে শিবাজির ন্যায় তার মনেও হিন্দুধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠায় প্রচণ্ড আগ্রহ জাগবে  -তাতেই দোষের কি? হিন্দু মন্দির গড়বে, হিন্দু ধর্মরাজ্য গড়বে সেটিই তো স্বাভাবিক। বাঙালী ও মুসলমানদের মাঝে চেতনার পরিচয়ে যে বিভাজন রেখা টানবেন তাতেই বা দোষের কি? মানুষে মানুষে বিভাজন তো গড়ে উঠে ধর্ম, সংস্কৃতি ও চেতনার সে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে। সে ভিন্ন পরিচয় নিয়ে বাঙালী হিন্দু  ও মুসলমানগণ যে সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন ধারার এবং তাদের মাঝে মিলন যে অসম্ভব সেটি রবীন্দ্রভক্ত বাঙালী মুসলিমগণ না বুঝলেও রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন। ফলে রবীন্দ্রনাথ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় হিন্দুত্বের সে ধারায় গিয়ে মিশে গেছেন। যে কোন মিশনারীর ন্যায় রবীন্দ্রনাথও চাইতেন অন্যরাও তার সে হিন্দুত্বের ধারায় মিশে যাক। হিন্দুত্বের সে ধারাটিতে রয়েছে ভারতের বুকে মুসলিম প্রভাবের বিলুপ্তির প্রবল ব্যগ্রতা। রয়েছে হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীনতা। এমন রবীন্দ্রনাথের ন্যায় এমন এক উগ্র হিন্দুর সাহিত্যকে আপন রূপে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এখানেই মুসলমানদের মূল সমস্যা। হিন্দুধর্ম রাজ্যের এমন এক উগ্র ধ্বজাধারিকে একজন মুসলমান তার নিজ চেতনার প্রতিনিধি রূপে গ্রহণ করে কি করে? তার লেখা গান ও  কবিতাই একজন মুসলমান গায় কি করে? এটি তো বিষপান। তার জন্ম দিনে উৎসবই বা করে কি করে? ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে রবীন্দ্রভক্ত বাংলাদেশীদের এখানেই বড় গাদ্দারি। এ গাদ্দারগণই মুসলিম চেতনায় লাগাতর বিষ ঢালছে।



স্বপ্নটি হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠার

শিবাজি মারা গেছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার দর্শন ও রাজনৈতিক অভিলাষটি মারা পড়েনি। ভারতে সে চেতনাটি বেঁচে আছে শিবসেনা, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ,বজরং দল ও ভারতীয় জনতা পার্টির ন্যায় বিভিন্ন উগ্র হিন্দুবাদি দলগুলোর মাঝে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও যে ভূগোলের স্বপ্নটি দেখতেন সেটি অবিভক্ত বাংলার নয়। সেটি অখণ্ড হিন্দু ধর্মরাজ্য ভারতের। নিজের  জীবদ্দশাতে রবীন্দ্রনাত সে হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকারটি দেখতে পেয়েছিলেন বাল গঙ্গাধর তিলকের রাজনীতিতে।তিলক তার কাছে গণ্য হয়েছিল শিবাজির মিশনকে এগিয়ে নেয়ার রাজনীতিতে আদর্শ নেতা রূপে। শিবাজী সে মিশনকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই তিলক নিজ রাজ্য মহারাষ্ট্রে শিবাজি উৎসবের শুরু করেন। সে উৎসবের সাথে একাত্মতার ঘোষণা দিতে বাঙালী কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্রনাথ বানার্জি ছুটে যান বোম্বাইয়ে। মারাঠীদের ন্যায় কলকাতার বাঙালী হিন্দুদের উদ্যোগে শিবাজি উৎসব শুরু হয় বাঙলার বুকেও।


শিবাজী তার হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার যুদ্ধটি শুরু করে মোগল সম্রাট আরোঙ্গজেবের সময়। কিন্তু সে প্রচেষ্ঠা ব্যর্থ হয়। বাংলার মানুষই শুধু নয়, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরাও শিবাজীর সে আন্দলনে সারা দেয়নি। শিবাজির মিশনটিকে চিনতে বাঙালীর সে ব্যর্থতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে প্রচন্ড আফসোস ছিল। কিন্তু এবারে তার মনে গভীর আনন্দ।এবং মনের সে বিপুল আনন্দ নিয়েই রবীন্দ্রনাথের শিবাজি উৎসব কবিতা। সেটি একারণে যে,বাঙালীরা শিবাজিকে চিনতে পেরেছে এবং তার দর্শন নিয়ে মারাঠীদের সাথে মিলে উৎসব শুরু হয়েছে। তবে বাঙালীদের থেকে রবীন্দ্রনাথের চাওয়াটি আরেকটু গভীর। তিনি চান, বাঙালীগণ আবির্ভূত হোক হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার সৈনিক রূপে। রবীন্দ্রনাথ এখানে আবির্ভূত হয়েছেন স্রেফ কবি হিসাবে নয়, বরং হিন্দু ধর্মরাজ্যে স্বপ্নদ্রষ্টা ও রাজনৈতিক নেতা রূপে। তাই তিনি লিখেছেন,

মারাঠার প্রান্ত হতে একদিন তুমি ধর্মরাজ,
ডেকেছিলে যবে
রাজা বলে জানি নাই, মানি নাই, পাই নাই লাজ
হে ভৈরব রবে।
তোমারে চিনেছি আজি, চিনেছি চিনেছি হে রাজন,
তুমি মহারাজ।
তব রাজকর লয়ে আট কোটি বঙ্গের নন্দন
দাঁড়াইবে আজ।


বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনটি রবীন্দ্রনাথের মনে যে কীরূপ উম্মাদনা সৃষ্টি করে সেটিই প্রকাশ পায় শিবাজি-উৎসব কবিতায়। মনের মাধুরি মিশিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

সেদিন শুনিনি কথা
আজি মোরা তোমার আদেশ
শির পাতি লব,
কণ্ঠে কণ্ঠে বক্ষে বক্ষে
ভারতে মিলিবে সর্বশেষ ধ্যান-মন্ত্র তব।
ধ্বজা ধরি উড়াইব বৈরাগীর উত্তরী বসন
দরিদ্রের বল,
এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে
এ মহাবচন করব সম্বল।
মারাঠির সাথে আজি,হে বাঙ্গালী
এক কণ্ঠে বল
জয়তু শিবাজী।
মারাঠির সাথে আজি,হে বাঙ্গালি,
এক সঙ্গে চলো মহোৎসবে সাজি।
আজি এক সভা তলে
ভারতের পশ্চিম পুরব দক্ষিণ ও বামে
একত্রে করুক ভোগ এক সাথে একটি গৌরব
এক পুণ্য নামে।



শিবাজীর মিশন থেকে আর দূরে থাকা নয়, রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে এবার ঘোষিত হলো শিবাজীর উগ্রহিন্দুত্বের দর্শন ও আন্দোলেনের সাথে কণ্ঠে কণ্ঠে বক্ষে বক্ষে পূর্ণ একাত্মতার ঘোষণা। সে  সময় তিলক ও অন্যান্য হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতাগণ শুরু করেন হিন্দুদের গো-দেবতা বাঁচানোর লড়াই। হিন্দুদের এ লড়াইয়ে আক্রমণের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মুসলমানগণ। কারণ, মুসলিমরা গরু জবাই করে গরুর গোশতো খায় অথচ গরু হিন্দুদের উপাস্য। গো-দেবতা হত্যা বন্ধ ও হত্যার প্রতিশোধ নিতে গড়ে তোলা হলো গরু রক্ষা সমিতি। এতে গরুর নিরাপত্তা বাড়লেও ভারত জুড়ে নিরাপত্তা হারালো মুসলিমের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। অথচ তাদের গো-দেবতার ভক্ষক শুধু মুসলিম ছিল না, ছিল খৃষ্টানগণও। অর্থাৎ খৃষ্টান ইংরেজগণ।কিন্তু হিন্দু নেতাদের দ্বারা খৃষ্টান বা ইংরেজগণ দেবতার ভক্ষক রূপে চিত্রিত হয়নি, ফলে তাদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদি হিন্দুদের কোনরূপ অভিযোগ বা  উচ্চবাচ্য ছিল না। ফল দাঁড়ালো,এ আন্দোলনের ফলে হিন্দু ও মুসলিমনগণ একে অপরের শত্রু রূপে চিহ্নিত হলো। শুরু হলো সংখ্যালঘিষ্ট মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃনা ও প্রতিশোধের স্পৃহা। শুরু হলো ভারত জুড়ে মুসলিম নির্মূলের দাঙ্গা।



মুসলিম বিদ্বেষী উগ্র রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের মুসলিম বিদ্বেষী ও উগ্র হিন্দুত্বের চেতনাটি শুধু শিবাজি-উৎসব কবিতায় সীমিত নয়। সেটির প্রকাশ পেয়েছে তার বিচার,মাসী,বন্দীবীর,হোলীখেলা কবিতায় এবং সমস্যা পুরাণ,দুরাশা,রীতিমত নভেলকাবুলিওয়ালা গল্পে মুসলিমদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ধারণাটি কীরূপ ছিল সেটি প্রকাশ পায় রীতিমত নভেল নামক একটি ছোটগল্পে। তিনি লিখেছেনঃ আল্লাহো আকবর শব্দে বনভূমি প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছে। একদিকে তিন লক্ষ যবন সেনা অন্য দিকে তিন সহস্র আর্য সৈন্য। পাঠক, বলিতে পার কাহার বজ্রমন্ত্রিত হর হর বোম বোম শব্দে তিন লক্ষ ম্লেচ্ছ কণ্ঠের আল্লাহো আকবর ধ্বনি নিমগ্ন হয়ে গেলো। ইনিই সেই ললিতসিংহ। কাঞ্চীর সেনাপতি। ভারত-ইতিহাসের ধ্রুব নক্ষত্র। রবীন্দ্রনাথের দুরাশা গল্পের কাহিনীটি আরো উৎকট মুসলিম বিদ্বেষে পূর্ণ। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, একজন মুসলিম নারীর হিন্দু ধর্ম তথা ব্রাহ্মণদের প্রতি কি দুর্নিবার আকর্ষণ এবং এই মুসলিম নারীর ব্রাহ্মণ হওয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠার চিত্র। রবীন্দ্রনাথে শেষ জীবনে যে মুসলমানির গল্পটি লিখিয়েছিলেন সে গল্পের নায়ক ছিলেন হবি খাঁ। হবি খাঁর মধ্যে তিনি উদারতার একটি চিত্র তূল ধরেছেন। তবে সে উদারতার কারণ রূপে দেখিয়েছেন,হবি খাঁর মা ছিল হিন্দু অভিজাত রাজপুতিনী। এভাবে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন,মুসলিম একক ভাবে মহৎ হতে পারেনা।


মুসলমান সমাজের প্রতি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির নিখুঁত পরিচয়টি পাওয়া যায় কণ্ঠরোধ (ভারতী, বৈশাখ-১৩০৫) নামক প্রবন্ধে। সিডিশন বিল পাস হওয়ার পূর্বদিনে কলকাতা টাউন হলে এই প্রবন্ধটি তিনি পাঠ করেন। এই প্রবন্ধে উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদী যবন, ম্লেচ্ছদের একটি ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন,কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান কলিকাতার রাজপথে লোষ্ট্র খন্ড হস্তে উপদ্রবের চেষ্টা করিয়াছিল। তাহার মধ্যে বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে- উপদ্রবের লক্ষ্যটা বিশেষরূপে ইংরেজদেরই প্রতি। তাহাদের শাস্তিও যথেষ্ট হইয়াছিল। প্রবাদ আছে- ইটটি মারিলেই পাটকেলটি খাইতে হয়; কিন্তু মূঢ়গণ (মুসলমান) ইটটি মারিয়া পাটকেলের অপেক্ষা অনেক শক্ত শক্ত জিনিস খাইয়াছিল। অপরাধ করিল, দণ্ড পাইল; কিন্তু ব্যাপারটি কি আজ পর্যন্ত স্পষ্ট বুঝা গেল না। এই নিম্নশ্রেণীর মুসলমানগণ সংবাদপত্র পড়েও না, সংবাদপত্রে লেখেও না। একটা ছোট বড়ো কাণ্ড হইয়া গেল অথচ এই মূঢ় (মুসলমান) নির্বাক প্রজা সম্প্রদায়ের মনের কথা কিছুই বোঝা গেল না। ব্যাপারটি রহস্যাবৃত রহিল বলিয়াই সাধারণের নিকট তাহার একটা অযথা এবং কৃত্রিম গৌরব জন্মিল। কৌতূহলী কল্পনা হ্যারিসন রোডের প্রান্ত হইতে আরম্ভ করিয়া তুরস্কের অর্ধচন্দ্র শিখরী রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত সম্ভব ও অসম্ভব অনুমানকে শাখা পল্লবায়িত করিয়া চলিল। ব্যাপারটি রহস্যাবৃত রহিল বলিয়াই আতঙ্ক চকিত ইংরেজি কাগজে কেহ বলিল, ইহা কংগ্রেসের সহিত যোগবদ্ধ রাষ্ট্র বিপ্লবের সূচনা; কেহ বলিল মুসলমানদের বস্তিগুলো একেবারে উড়াইয়া পুড়াইয়া দেয়া যাক, কেহ বলিল এমন নিদারুণ বিপৎপাতের সময় তুহিনাবৃত শৈলশিখরের উপর বড়লাট সাহেবের এতটা সুশীতল হইয়া বসিয়া থাকা উচিত হয় না। -এই হলো হলো নির্ভেজাল রবীন্দ্র চেতনা। মুসলিম এবং ইসলামের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের মগজ যে কতটা বিষপূর্ণ ছিল সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকি থাকে?


গুরু মুসলিম নিধনের

রবীন্দ্রনাথের পরিবারের জমিদারী ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর, রাজশাহীর পতিসর প্রভৃতি অঞ্চলে। আর এই অঞ্চলগুলি ছিল মুসলিম প্রধান। মুসলিম প্রজাগণই তার রাজস্ব জোগাতো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ব্যর্থ হন সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজাদের সাথে মনের সংযোগ বাড়াতে। তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়েও তিনি কোনদিন মাথা ঘামাননি। প্রজাদের জোগানো অর্থ দিয়ে মুসলিম প্রধান কুষ্টিয়া, পাবনা বা রাজশাহীতে তিনি একটি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন তার প্রমাণ নাই। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন হিন্দুপ্রধান পশ্চিম বাংলার বোলপুরে। উল্টো তার সাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের বিরুদ্ধে উগ্র সাম্প্রদায়িক মনভাব। উৎকট মুসলিম বিরোধী সংলাপ দেখা যায় তার নাটকে। নাটকের নট-নটিরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে যা বলে তা তাদের নিজেদের কথা নয়।নিজেদের ইচ্ছায় কিছু বলার অধিকার তাদের থাকে না। তারা তো তাই বলে যা নাট্যকার তাদের মুখ দিয়ে বলাতে চায়। ফলে নাটকের সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় নাট্যকারের মনের চিত্রটি। মুসলিম বিরোধী রবীন্দ্রমনের সে কুৎসিত চিত্রটি প্রকাশ পেয়েছে তার রচিত প্রায়শ্চিত্ত নাটকে। প্রতাপাদিত্যের মুখ দিয়ে তিনি উচ্চারন করান,খুন করাটা যেখানে ধর্ম, সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম। সাহিত্যের নামে এ ছিল মুসলিম নিধনে রবীন্
...

 

কোন মন্তব্য নেই:

Post Top Ad

Responsive Ads Here