সাম্প্রদায়িকতা ও ইসলাম-রেডিও তেহরান
মাহমুদ জাবির : ধর্মবিরোধীরা ধর্ম
সম্পর্কে এমন মন্তব্য করে থাকেন যে, পৃথিবীর বড় অশান্তির মূলে রয়েছে ধর্ম।
ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সংঘাত পৃথিবীর বড় অশান্তির কারণ।
পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল ধর্মের বিরোধিতা
করতে গিয়ে ধর্মবিরোধীরা ভিন্ন
ধরণের মতবাদ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। এ
ধরনের একটি মতবাদের নাম সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজম ইহজাগতিক মতবাদ। ভিন্ন
ভিন্ন আদর্শের নামে সেক্যুলারিজমে রয়েছে ধর্মের উপস্থিতি। এর মধ্যে প্রধান
দু’টি ধর্ম হলো পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র। ধর্ম যদি অশান্তির মূল হয়, তাহলে
নিশ্চয়ই শান্তির মূলে রয়েছে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র। পুঁজিবাদে ঈশ্বর হলো
'পুঁজি', আর সমাজতন্ত্রে ঈশ্বর হলো 'বস্তু'। পুঁজির আর বস্তুর উপাসনায় কি
শাশ্বত শান্তি সুনিশ্চিত হয়? সমাজ অধ্যয়ন করলে বিষয়টি বুঝা যাবে।
বিভিন্ন ধর্মের মধ্যকার বিরোধের পাশাপাশি
সেক্যুলারিজমের বিভেদ ও বিভক্তি স্পষ্ট। সেক্যুলারিজমেও রয়েছে
সাম্প্রদায়িকতা ও বিভাজন। পুঁজিবাদী সম্প্রদায় আর সমাজতান্ত্রিক সম্প্রদায়
পারস্পারিক দ্বন্দ্ব, সংঘাতে নিমজ্জিত। মার্ক্স, এঙ্গেলস পুঁজিবাদী
ব্যবস্থার উচ্ছেদ করতে রক্তাক্ত সংঘাতের আহ্বান জানান। পুঁজিবাদী গোষ্ঠীরাও
শ্রেণীসংঘাত নির্মূলে রক্তাক্ত নিষ্ঠুর দমন নিপীড়নকে বেছে নিয়েছে। মার্ক্স
কেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ধ্বংসের আহ্বান জানান? পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তো
সেক্যুলার ব্যবস্থা, ধর্মীয় নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কেন অনিষ্টকর? কেননা এ
ব্যবস্থা মুনাফাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে শোষণ, জুলুমকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলছে।
এর মানে মানুষ পুঁজির উপাসনা করলে শোষণ- জুলুম বেড়ে যাবে, আল্লাহ্কে
উপাসনা করলে নয়।
অন্যদিকে বস্তুর উপাসনা করলে কি মানুষ নৈতিক হতে পারে? বস্তু কি করে মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করবে? বস্তুর উপাসনায় মানুষ আত্মস্বার্থ, আত্মঅধিকারকে গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাবোধ ও ত্যাগস্পৃহা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এ কারণে বস্তুবাদ নৈতিকতা পরিপন্থী।
সেক্যুলারিজম আরেকটি উপধর্ম সৃষ্টি করেছে
তার নাম জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও সংঘাত
তীব্রতর হয়েছে। জাতীয়তাবাদ হাজারো সেক্যুলার সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সৃষ্টি
করেছে। জাতীয়তাবাদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসী গোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে জাতীয়
সম্প্রীতি, জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় স্বার্থের নামে ভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীদের দমন,
নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে মানবজাতিকে কঠিন সংকটের মুখোমুখি করেছে।
জাতীয়তাবাদের প্রতি মোহগ্রস্থ হয়ে প্রতিটি জাতি স্বৈরাচারী ক্ষমতালোভী
শাসককে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে চলছে। এর ফলে এক জাতি অন্য জাতিকে নির্মূলের
নেশায় মেতে উঠেছে। অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্স- ব্রিটেনের যুদ্ধ, প্রথম ও
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলোর জোটবদ্ধ আক্রমণ, হত্যা, লুণ্ঠন
আমাদের সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের সৃষ্ট করুণ ও নিকৃষ্ট সভ্যতার মুখোমুখি
করেছে। সে কারণে ধর্ম বিরোধী বারট্রান্ড রাসেল বলেন- “এতে কোনো সন্দেহ নেই
যে, জাতীয়তাবাদ হলো আমাদের সময়ের সবচেয়ে অশুভ শক্তি। মাতলামি, মাদক সেবন,
বাণিজ্যে অসাধুতা কিংবা অন্য যেকোনো অকল্যাণের চেয়ে ক্ষতিকর।”
আজকের যুগে এক দেশের সাথে আর এক দেশের
শত্রুতা,যুদ্ধ,বিগ্রহ অব্যাহত রাখার জন্য জাতীয়তাবাদ সক্রিয় ভূমিকা রেখে
চলছে। জাতীয়তাবাদী চেতনায় পরদেশ লুণ্ঠন, হত্যা, গণহত্যা সমর্থিত হয়ে যায়।
আমেরিকা, ইরাক আফগানিস্তানে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করলে মার্কিন জনগণ সেই
বুশকে আবার নির্বাচিত করে। এর মূল কারণ জাতীয়তাবাদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস,
ধর্ম নয়।
বিশ্বশান্তির প্রতি আরেকটি হুমকি হলো
বর্ণবাদ। বর্ণবাদের ভিত্তিতে যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তাতে পারস্পারিক
শত্রুতা, ঘৃণা, অবিচার বেড়েই চলছে। ইউরোপে, আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকায়
কৃষ্ণাঙ্গরা যেভাবে নির্যাতিত, নিপীড়িত হচ্ছে তাতে মানবতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
যে কতগুলো উপাদান বিশ্বশান্তির অন্তরায়
হয়ে কাজ করছে সেগুলো কি ইসলাম ধর্ম অনুমোদন দিয়েছে? আল-কুরআন অধ্যয়ন করে
দেখুন ইসলামে ঐ সকল বিষয় অনুমোদন পায়নি যেগুলো মানবশান্তির হুমকিস্বরূপ।
ইসলামে এক আল্লাহ্ ছাড়া সকল উপাসনা নিষিদ্ধ । পুঁজির উপাসনা, বস্তুর
উপাসনা এমনকি স্বৈরাচারী শাসক ও অন্য কোন মানুষের উপাসনা বাতিল ঘোষিত
হয়েছে। ইসলামের বর্ণবাদিতার কারণে ইবলিশ অভিশপ্ত হয়েছে। এমনকি জাতিবিদ্বেষ ও
কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ অন্যায় ও পাপ বলে ঘোষিত হয়েছে। কুরআন অন্য
সম্প্রদায়কে গালিসূচক বাক্য বলতে বারণ করেছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
“কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনই সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না
করে। সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করবে।” (৫:২)
এ থেকে কী বুঝা যায় না- ইসলাম
সম্পূর্ণরূপে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী। ইসলাম সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে উস্কে দেয়
না, বরং সৎকর্মে পারস্পারিক সহযোগিতার আহ্বান জানায়। যারা ধর্মের নামে
সাম্প্রদায়িক সংঘাতে জড়িত তা তো ধর্মসম্মত নয়। যে আচরণ ধর্ম অনুমোদন করেনি
তাকে ধর্মীয় আচরণ বলা এক ধরণের অজ্ঞতা। সে অজ্ঞতা থেকে যখন ধর্ম বিদ্বেষ
সৃষ্টি হয় তা প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে উস্কে দেয়। এর
মানে সাম্প্রদায়িকতা ধর্মবিশ্বাসের ফল নয়। সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও
দ্বন্দ্ব-সংঘাত ধর্মসম্পর্কিত অজ্ঞতা ও ধর্মবিদ্বেষের যৌথ প্রযোজনায় সৃষ্টি
ও বৃদ্ধি পায়।
ইসলাম ধর্ম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে অধিক
গুরুত্ব প্রদান করে এবং জাতিগত বিভেদের বিরোধিতা করে। আল কুরআনের সূরা
হুজরাতে বলা হয়েছে- “হে মানুষ! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি
করেছি, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি, গোত্রে, যাতে তোমরা একে
অপরের সাথে পরিচিত হতে পার।’’ (৪৯:১৩)
এ থেকে স্পষ্ট, ইসলাম বিভিন্ন জাতি-
গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়, বিভেদ- শত্রুতা নয়। বরং
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসহীনতা থেকে জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদে বিশ্বাস জন্ম নিতে
পারে। কেননা ইহজাগতিক চেতনা থেকে মানুষ বস্তু, বর্ণ বা বংশ ও ভৌগোলিক
সীমাবদ্ধতা অনুযায়ী উচ্চ-নীচ ধারণা সৃষ্টি হলে জাতিভেদ, বর্ণবাদ ও
সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হয়। অথচ ইসলাম জাতি ও বর্ণবিদ্বেষকে ধর্মবিরোধী
হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইসলাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়- জ্ঞান অর্জনের মধ্য
দিয়ে অজ্ঞতার বিনাশ, বিচারবুদ্ধি দিয়ে বিবেচনার মধ্য দিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি
এবং মানুষের প্রতি ন্যায়বোধ জাগ্রত করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বিভাজনের
উচ্ছেদ। মোটকথা বিশ্বব্যাপী অশান্তির কারণ ধর্ম নয়, ইহজাগতিকতা।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
(মতামত প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব, রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নয়।)
রেডিও তেহরান/এআর/১৮
(মতামত প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব, রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নয়।)
রেডিও তেহরান/এআর/১৮

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন